নিজস্ব প্রতিবেদক
‘ও বাপ, আমার ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আমার স্বামীকে ফেরত দিন’—কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের কাছে এমনই আকুতি জানাচ্ছিলেন মোস্তাক আহমদের স্ত্রী। স্বামীকে বাঁচাতে কত টাকা দিতে পারবেন, কোথা থেকে টাকা জোগাড় করবেন—কিছুই জানতেন না তিনি। শুধু জানতেন, যেকোনো মূল্যে স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে হবে।
অবশেষে তিন দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর পরিবারের কাছে ফিরেছেন টেকনাফের হ্নীলা বাজারের দর্জি দোকানদার মোস্তাক আহমদ (৩১)। শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মোস্তাক টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৫ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক নিখোঁজ হন। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁর পরিবারের কাছে একটি ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, মোস্তাককে অপহরণ করা হয়েছে। তাঁর মুক্তির জন্য ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
এরপর একের পর এক ফোন আসতে থাকে। বাড়তে থাকে মুক্তিপণের অঙ্কও। কখনো ৫০ লাখ, কখনো ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকায় রাজি হয় অপহরণকারীরা।
পরিবারের ভাষ্য, মুক্তিপণের টাকা নিয়ে মোস্তাকের বোনজামাইকে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় যেতে বলা হয়। অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর তাঁরা টাকা নিয়ে সেখান থেকে সরে যায়। পরে অন্য একটি স্থানে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, অপহরণের সময় মোস্তাককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
মোস্তাককে উদ্ধারের আগে তাঁর পরিবারের ওপর দিয়ে যেন দুঃস্বপ্নের মতো সময় গেছে। অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
ওই ফোনালাপে মোস্তাকের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের অনুরোধ করেন, তাঁর স্বামীকে যেন মারধর বা হত্যা করা না হয়। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি।’
জবাবে অপহরণকারীরা হুমকি দিয়ে জানায়, ৫০ লাখ টাকা না দিলে মোস্তাককে হত্যা করা হবে। এমনকি তারা দাবি করে, মোস্তাককে হত্যার জন্য একজন তাদের ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে।
স্বামীকে বাঁচাতে অসহায় স্ত্রী বলেন, ‘আমি যতটুকু পারি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি এত টাকা কোথায় পাব?’
একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।
পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, তাঁকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে।
স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে মোস্তাক তাঁর স্ত্রীকে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করতে বলেন। এদিকে অপহরণকারীরা হুমকি দেয়, বিষয়টি কাউকে জানানো হলে মোস্তাককে হত্যা করা হবে। স্বামীকে বাঁচানোর আশায় তাঁর স্ত্রী তখন বারবার অনুরোধ করেন, ‘আমি কাউকে বলব না। আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না।’
শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন দিনের উৎকণ্ঠা, ভয় ও অনিশ্চয়তার পর পরিবারের কাছে ফিরে আসেন তিনি।
মোস্তাকের মা হাসান বানু বলেন, ‘ছেলেকে অপহরণের পর আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। অপহরণকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর আমার ছেলে বাড়িতে ফিরেছে।’
মোস্তাক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর শাশুড়ি নুর নাহার গত ৫ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক আহমদ নিখোঁজ হয়েছেন। জিডি নম্বর ২৭২।
মোস্তাককে উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে যাওয়া এক ব্যক্তি জানান, তাঁর বন্ধু মোস্তাক পাওনা টাকা আদায়ের জন্য হ্নীলা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাহারছড়া এলাকায় এক ব্যক্তির কাছে যান। টাকা নিয়ে সিএনজিযোগে ফেরার পথে দুই ব্যক্তি গাড়িতে থাকা মোস্তাকের মুখ চেপে ধরে তাঁকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়।
ওই ব্যক্তি আরও জানান, শনিবার বিকেল ৫টার দিকে তিনি ও মোস্তাকের বোনজামাই ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে সেখানে যান। রাত ৯টার দিকে মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে অপহরণের বিষয়ে এসব তথ্য জানা যায়। তাঁর দাবি, মোস্তাককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন—এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’
তিনি বলেন, ‘মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।’
